ধর্ষণের ১৩ বছরঃ ঘনীভূত হতে থাকা এই অন্ধকারে আলো আসবে কবে?

ধর্ষণ, মানবদেহের দ্বারা করা সবচেয়ে জঘন্যতম কাজগুলির একটি, যা এখন বাংলাদেশের নিত্যদিনের ঘটনা। এমন কোন একদিনও নাই যে, ধর্ষণের খবর সংবাদপত্রে দেখা যায় না। বরং নারী ও শিশুদের উপর ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনার হার ও সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটি এখনই থামছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিদিন, ৩ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সী মহিলাদের এবং শিশুরা বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে গণধর্ষণের বিষয়টিও প্রচলিত রয়েছে। এর সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। তা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলে বুঝতে কারো বাকি থাকবে না।

১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের শিকার ৪ হাজার ৩০৪ জনের মধ্যে ৭৪০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,

  • ২০০৮ সালে ধর্ষণের শিকার ৩০৭ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১১৪ জনকে।
  • ২০০৯ সালে ধর্ষণের শিকার ৩৯৩ জনের মধ্যে ১৩০ জনকে হত্যা
  • ২০১০ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৯৩ জনের মধ্যে ৬৬ জনকে হত্যা
  • ২০১১ সালে ধর্ষণের শিকার ৬৩৫ জনের মধ্যে ৯৬ জনকে হত্যা
  • ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৫০৮ জনের মধ্যে ১০৬ জনকে হত্যা
  • ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৫১৬ জনের মধ্যে ৬৪ জনকে হত্যা
  • ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৪৪ জনের মধ্যে ৭৮ জনকে হত্যা এবং
  • ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৮ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৮৫ জনকে।

অর্থাৎ অনেক সোহাগীকে এই পৃথিবী ছাড়তে হয়েছে শুধু ধর্ষণের কারণে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন।  অর্থাৎ এক বছরে ধর্ষিতার সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। অন্যদিকে ধর্ষকের সংখ্যাও তো বেড়েছে।

২০২০ সালে ধর্ষণের ঘটনার সর্বশেষ পরিসংখ্যান ভাল মনে হচ্ছে না। বরং দিন দিন এটি বাড়ছে। ধর্ষণের পরে নারীদের হত্যার ঘটনাটি বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ। যদিও ধর্ষণের ঘটনা রোধে দেশে কঠোর ও দ্রুত আইন ছিল, তবুও থেমে নেই। আপনি ২০২০ এ বাংলাদেশে সর্বশেষ ধর্ষণ মামলার রিপোর্ট এবং পরিসংখ্যান পরীক্ষা করতে পারেন। ২০২০ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার কী তাও আপনি দেখতে পারেন।

সরকারের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের তথ্য অনুসারে, ২০০১ থেকে জুলাই ২০২০ সালের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, ২০০০ আইনের অধীনে দায়ের করা মামলার মাত্র ৩.৫৬ শতাংশই আদালতের রায় দিয়েছে এবং কেবলমাত্র ০.৩৭ শতাংশ মামলা রয়েছে। প্রত্যয় দিয়ে শেষ।

বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর অধীন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার হয়। এই বিপুল সংখ্যক মামলার পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে দেশে পারিবারিক সহিংসতা অনেক বেশী। এমনকি করোনাকালে সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এর মতে, বর্তমান করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতা ৬৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিশুর প্রতি সহিংসতা ৩১% বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা, জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশে করোনা মহামারির প্রথম তিন মাসে পারিবারিক সহিংসতা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) অনুসারে শাস্তির বিধান

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) – এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধের যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো:

(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ৷

(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার নিষেধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ৷

(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-
(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ;
(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে ব্যক্তি অনধিক দশ বত্‍‌সর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বত্সর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ৷

(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বত্সরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ৷

এছাড়া উল্লেখ্য যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর ৩২ ধারা মতে ধর্ষিতা নারী ও শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা ধর্ষণ সংঘটিত হবার পর যত শীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এতে অবহেলা করলে আদালত চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রেখেছেন।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ দন্ড বিধি , জাতীয় ই-তথ্যকোষ

মহিলা ও মেয়েরা নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা বা আইনী সঙ্গতি ছাড়াই ব্যাপক সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হন।

আইন কঠোর এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু কঠোর আইন থাকলেই অপরাধ কমে যাবে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে অন্তত বাংলাদেশে তা বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কঠোর আইনের প্রয়োজন নেই; বরং খুব জোর দিয়ে বলতে চাই, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা আইন প্রণয়নের মতোই জরুরি দায়িত্ব। ধর্ষণের বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার কার্যকারিতা যে হতাশাব্যঞ্জক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা সবাই ধর্ষন নিয়ে কঠিন শাস্তির কথা বলছি। আমরা চাই ধর্ষনের জন্য আরো কঠিন শাস্তির বিধান করা হোক, যেমন একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড যদিও প্রচলিত আইনে মোটামুটি কঠোর একটি আইনের বিধান রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে সেই আইনটি প্রয়োগ হয় না। আপাতত ভাবে আপনার আমার সামাজিক দায়িত্ব হলো, এই আইন এর প্রয়োগের জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

Zahid Jewel

I am Zahid Jewel, a digital marketer, and SEO expert. I am here to share my knowledge and skills. Do you want to learn more about me? Type " zahid jewel " on google and search. You will get all information.

2 thoughts on “ধর্ষণের ১৩ বছরঃ ঘনীভূত হতে থাকা এই অন্ধকারে আলো আসবে কবে?

  • October 12, 2020 at 7:19 pm
    Permalink

    তোমার ইচ্ছা আর আমাদের দোয়া৷ তোমার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে ইনশাআল্লাহ, ❤️

    Reply
  • November 4, 2020 at 4:37 pm
    Permalink

    Как зайти на гидру? Этим вопросом задаются все пользователи гидры, каждый день приходится искать рабочее зеркало гидры т.к. изо дня в день зеркала банятся правительством и доступа к ресурсу нет, использовать VPN сложно и дорого, тор на английском языке что тоже не всем подходит. Специально для максимального облегчения этой задачи мы разработали наш сайт. Для открытия hydra2web.com Вам нужно перейти по актуальному рабочему зеркалу указанному выше или либо скопировать ссылку для тор браузера которая также указана на нашем сайте и открыть ее в тор браузере, после чего пройти регистрацию, пополнить баланс и радоваться покупкам. Не забывайте помогать развитию портала делитесь нашим ресурсом с друзьями и знакомыми.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!