স্বাস্থ্য

পেয়ারার উপকারিতা ও অপকারিতা

5/5 - (16 votes)

এই নিবন্ধে, আমরা আপনাকে পেয়ারা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলছি। আয়ুর্বেদে পেয়ারার অনেক উপকারিতা বলা হয়েছে। পেয়ারা বাংলাদেশে পাওয়া একটি সাধারণ ফল। এর গাছ প্রায় অধিকাংশ বাড়িতে বা গ্রামাঞ্চলে পাওয়া যায়। কিছু পশ্চিমা পণ্ডিত বলেছেন যে এটি আমেরিকা থেকে পর্তুগিজরা এখানে নিয়ে এসেছে এবং একই সাথে এটাও বলা হয়েছে যে পেয়ারা গাছ বাংলাদেশের অনেক জায়গায় জঙ্গলে রয়েছে। কিন্তু সত্য হলো বুনো আম, কলা ইত্যাদির মতোই এখানে প্রাচীনকাল থেকেই উৎপন্ন হয়ে আসছে এবং এটিই এখানকার আদি ফল।

Contents

পেয়ারার পরিচিতি

এর প্রাচীন সংস্কৃত নাম অমৃত বা অমৃত ফল এবং বেনারসে প্রায় সবাই একে অমৃত নামে ডাকে। পেয়ারার স্বাদ টক, মিষ্টি এবং ম্লান দুই বা তিন ধরনের। সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি পেয়ারার ঔষধিগুণ খুবই পুষ্টিকর। মানুষ অনেক রোগ নিরাময়ের জন্য এটি একটি ঘরোয়া প্রতিকার হিসাবে ব্যবহার করে।

পেয়ারার পরিচিতি

বিভিন্ন ভাষায় পেয়ারার নাম

পেয়ারার ল্যাটিন নাম হল Psidium guajava L. (Sidium guajava)। এর পারিবারিক নাম: Myrtaceae (Myrtaceae)। অন্যান্য ভাষায় একে নিম্নলিখিত নামে ডাকা হয়

ইংরেজি: সাধারণ পেয়ারা
ইংরেজি: পেয়ারা, জামফল
তেলুগু: (তেলেগুতে পেয়ারা মানে) – এট্টাজামা, জামাকায়া (ইংরেজিতে জামাকায়া)
তামিল: কোয়া, সেগাপুগোয়া, সেগাপু, সিরোগোয়া, সেনগোয়া; গোয়া
মারাঠি: জাম্বা
সংস্কৃত: ধ্রুধাবিজম, মৃদুফলম, অমৃতফলম, পেরুক, বিহি;
উর্দু: আমরুদ
ওডিয়া: বোজোজামো;
আসাম: মধুরিয়াম, মুহুরিয়াম;
কন্নড় : জামফল;
গুজরাটি: জামরুদ, জামরুখ;
বাংলা: গোয়াছি, পেয়ারা, পিয়ারা;
নেপালি: অম্বা, অম্বাক, অমুক;
পাঞ্জাবি: আনজিরজার্ড, পেয়ারা (আমরুদ);
মালয়ালম: কোয়া, মালাক্কাপেরা, পেরা; টুপকেল
আরবি: পেয়ারা (আমরুদ), জুদাকনেহ (জুদাকানেহ), কামশার্নি (কামশার্নি);
ফার্সি- পেয়ারা।

পেয়ারার উপকারিতা ও ব্যবহার

পেয়ারায় আছে মাতৃদুগ্ধ বৃদ্ধি, মল রোধ, পুরুষত্ব বৃদ্ধি, বীর্য বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্ক শক্তিশালী করার পুষ্টিগুণ। পেয়ারার ঔষধি গুণ তৃষ্ণা মেটায়, হৃৎপিণ্ডকে শক্তিশালী করে, কৃমি নাশ করে, বমি বন্ধ করে, পেট পরিষ্কার করে এবং কফ দূর করে। মুখের ঘা, মস্তিষ্ক ও কিডনির সংক্রমণ, জ্বর, মানসিক রোগ ও মৃগীরোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এর সেবন উপকারী। আসুন পেয়ারার প্রধান উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।

পেয়ারা মাথাব্যথা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে

সূর্যোদয়ের আগে কাঁচা সবুজ পেয়ারা মাথায় যেখানে ব্যথা আছে সেখানে ঘষে খুব ভালোভাবে লাগালে মাথাব্যথা হয় না। ব্যথা শুরু হলে তা শান্ত হয়। এই পরীক্ষাটি দিনে তিন থেকে চারবার করা উচিত।

সর্দি এবং কাশিতে পেয়ারার উপকারিতা

ঠাণ্ডাজনিত বৃদ্ধ রোগীকে, যার কফ বের হচ্ছে না, তাকে একটি বড় পেয়ারার বীজ খাওয়ান এবং নাক বন্ধ করে উপর থেকে বিশুদ্ধ পানি পান করান। দুই-তিন দিনের মধ্যে, থেমে যাওয়া ঠান্ডা প্রবাহিত হবে এবং পরিষ্কার হয়ে যাবে। দুই-তিন দিন পর ক্ষরণ বন্ধ হলে রাতে পানি না খেয়ে ৫০ গ্রাম গুড় খান। শুকনো কাশি থাকলে এবং কফ না থাকলে একটি তাজা পেয়ারা সকালে চিবিয়ে খেলে ২-৩ দিনে উপকার পাওয়া যায়। ব্লেন্ডার মেশিনের সাহায্যে পেয়ারার নির্যাস নিয়ে তাতে মধু মিশিয়ে খেলেও শুকনো কাশিতে উপকার পাওয়া যায়। একটি গবেষণা অনুসারে, পেয়ারা পাতা খাওয়া ঠান্ডা এবং কাশি উপশমে সহায়ক কারণ পেয়ারাতে পাওয়া ভিটামিন-সি শরীরকে সর্দি-কাশির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।

মুখের স্বাস্থ্য এবং দাঁতের ব্যথার জন্য পেয়ারার উপকারিতা

পেয়ারার ৩-৪টি পাতা চিবিয়ে বা পাতার ক্বাথের সাথে কটকটি মিশিয়ে গার্গল করলে দাঁতের ব্যথা উপশম হয়। পেয়ারার নরম পাতায় ক্যাচু মিশিয়ে পানের মতো চিবিয়ে খেলে মুখের ঘা সেরে যায়। পেয়ারা পাতা পানিতে সিদ্ধ করে একটি ক্বাথ তৈরি করুন। এই ক্বাথের মধ্যে লবণ মিশিয়ে মুখে 4-5 মিনিট রেখে গড়্গড়া করলে মুখের ঘা, মুখের রক্তপাত ও মুখের রক্তক্ষরণে উপকার পাওয়া যায় এবং দাঁত সুস্থ থাকে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে পেয়ারার উপকারিতা

পেয়ারার ঔষধিগুণ পেতে ফলের বীজ বের করে ভালো করে কেটে চিনি মিশিয়ে অল্প আঁচে চাটনি বানিয়ে খেলে হৃদরোগ ও কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকার পাওয়া যায়।

পেয়ারা বমি থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে

বমি হলে পেয়ারার ব্যবহারে বমি বন্ধ করা যায়। এর জন্য পেয়ারা পাতার 10 মিলি ক্বাথ নিন। এটি খেলে বমি বন্ধ হয়।

ডায়াবেটিসে পেয়ার উপকারিতা

পেয়ারা ছোট ছোট টুকরো করে কেটে পানিতে দিন। কিছুক্ষণ পর এই পানি পান করলে ডায়াবেটিস বা পলিউরিয়ায় উপকার পাওয়া যায়।

পেয়ারা আমাশয়ে উপকারী

শিশুর পুরাতন আমাশয় দূর করতে ১৫ গ্রাম পেয়ারার মূল ১৫০ মিলি পানিতে সিদ্ধ করে অর্ধেক পানি অবশিষ্ট থাকলে ৬-৬ মিলি পান করুন। এটি দিনে দুই থেকে তিনবার দিতে হবে। কাঁচা পেয়ারা ভুনা করে খাওয়ালে ডায়রিয়াতেও উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারার ছাল এবং এর নরম পাতার একটি ক্বাথ তৈরি করুন এবং এর সাথে 20 মিলি মিশ্রিত করুন। কলেরার প্রাথমিক অবস্থায় পরিমাণমত খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়।

পেয়ারার ছালের ক্বাথ বা ছালের গুঁড়া ৫-১০ গ্রাম খেলে আমাশয়, কলেরা, খাদ্যে বিষক্রিয়া, বমি ও হজমের উপশম হয়। পেয়ারার মোরব্বা আমাশয় ও ডায়রিয়ায় উপকারী। পেয়ারার নতুন পাতা পিষে রস বের করে নিন। এই রসে চিনি মিশিয়ে সকালে সেবন করলে সাত দিনে বদহজম রোগে উপকার পাওয়া যায়।

পেয়ারা কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে

সকালে নাস্তায় কালো গোলমরিচ, নুন ও আদা দিয়ে পেয়ারা খেলে বদহজম, টক টক, পেট ফাঁপা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ হবে এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি পাবে। দুপুরের খাবারের সময় পেয়ারা খেলে অন্ত্রের ব্যথা ও ডায়রিয়ায় উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারার গুণাগুণের উপকারিতা পেতে হলে এটি সঠিক পরিমাণে সেবন করা প্রয়োজন।

পেয়ারার মোরব্বা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য একটি নিশ্চিত প্রতিকার। আপনি যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাহলে পেয়ারার মোরব্বা আপনার জন্য উপকারী হতে পারে, কারণ পেয়ারায় রয়েছে রেচক উপাদান যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

পেয়ারা পেটের ব্যথা নিরাময়ে উপকারী

আপনার যদি অ্যাসিডিটির কারণে পেটে ব্যথার পাশাপাশি পেটে জ্বালাপোড়া হয়, তবে পেয়ারা পাতার একটি ক্বাথ আপনার জন্য উপকারী হতে পারে কারণ এতে ক্ষারীয়তার বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অ্যাসিডিটি শান্ত করে এবং পেটে আরাম দেয়। পেয়ারা ফল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পেটের ব্যথায় উপশম দেয়।

দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে পেয়ারার উপকারিতা

আপনার যদি দাঁতে ব্যথা হয়, তাহলে পেয়ারা পাতা চিবিয়ে খাওয়া আপনার জন্য উপকারী, কারণ এর তেজস্ক্রিয় গুণের কারণে এটি ব্যথায় উপশম দেয় এবং মুখের মধ্যে ফোসকা বা ক্ষত থাকলে নিরাময়েও সাহায্য করে।

সর্দি নিরাময়ে পেয়ারার উপকারিতা

শরীরে শীতলতা আনতে পেয়ারা সেবন একটি উত্তম প্রতিকার কারণ আয়ুর্বেদ অনুসারে পেয়ারার প্রভাব ঠান্ডা, তাই এর সেবন শরীরে শীতল করে।

হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পেয়ারার উপকারিতা

আপনার যদি হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি থাকে তবে পেয়ারা খাওয়া উপকারী হতে পারে কারণ পেয়ারা আয়রন সমৃদ্ধ।

পেয়ারা নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ নিরাময়ে উপকারী

ত্বক ফর্সা করতেও পেয়ারা পাতা ব্যবহার করা হয়। পেয়ারা পাতার পেস্ট ব্রণ দূর করে এবং ত্বকের উন্নতি ঘটায় কারণ এতে রয়েছে অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্ট বৈশিষ্ট্য যা ত্বকের ময়লা দূর করে এবং তৈলাক্ত উপাদান নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্রণ আসা রোধ করে।

পেয়ারা অ্যাসিডিটি দূর করতে সাহায্য করে

পেয়ারার বীজ পিষে এবং গোলাপ জল এবং চিনি মিশ্রিত করার পরে এটি পান করুন, এটি খুব উচ্চ অম্লতাতে উপশম দেয়।

বিশেষ: পেয়ারা পাতার উপকারিতা পেতে পাতার রস পান করলে বা পেয়ারা খেলে গাঁজা, দাতুরা ইত্যাদির নেশা শেষ হয়।

পেয়ারার অপকারিতা

গর্ভবতী মহিলা এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের, বিশেষত, পেয়ারার অত্যধিক ব্যবহার এড়ানো উচিত, কারণ মহিলারা তাদের উচ্চ ফাইবার উপাদানের কারণে ডায়রিয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

কিভাবে পেয়ারা সেবন করবেন

ফল হিসেবে পেয়ারা খেতে পারেন। আপনি যদি এটি ঔষধিভাবে ব্যবহার করতে চান তবে এটি আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করুন।

ডোজ এবং গ্রহণ পদ্ধতি:
কোয়াথ 10-20 মিলি

পেয়ারা কোথায় পাওয়া যায় বা জন্মায়
বাংলাদেশে পেয়ারা গাছ প্রায় সর্বত্র বিশিষ্টভাবে পাওয়া যায়। বান্দলাদেশ ছাড়াও, এটি দক্ষিণ আমেরিকার পেরুভিয়ান দেশেও দেখা যায় এবং তাই ইউরোপীয়রা এটিকে পেরু ফলও বলে। এর ফল সবুজ-হলুদ, লাল (গোলাপী পেয়ারা) বা লাল বিন্দু চিহ্নিত হলুদ বর্ণের। শরতের ফল বর্ষার চেয়ে মিষ্টি ও সুস্বাদু। এটি বন্য এবং উদ্যানগত উভয় প্রকারেই পাওয়া যায়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শীতকালে কি পেয়ারা খাওয়া উচিত?

আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে, শীত মৌসুমে পেয়ারা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এটি খেলে হজম প্রক্রিয়া যেমন ঠিক থাকে, তেমনি এতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। তাই শীতকালে প্রতিদিন তাজা পেয়ারা খান।

পেয়ারা খাওয়া কি পেটের জন্য উপকারী?

বেশির ভাগ মানুষই শীতে পেট সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগে থাকেন এবং দেখা গেছে এই সব সমস্যা হয় পাচনতন্ত্রের সঠিকভাবে কাজ না করার কারণে। এমন পরিস্থিতিতে পেয়ারা খাওয়া খুবই উপকারী কারণ এতে উপস্থিত ফাইবার পেট পরিষ্কার এবং পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

পেয়ারা পাতাও কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

পেয়ারার ফল যেমন সুস্বাদু ও উপকারী এর পাতাও তেমনই উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেয়ারার পাতায় ইমিউনোমোডুলেশন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি বাড়ায় এবং অনেক মৌসুমি রোগ থেকে রক্ষা করে।

আরো পড়ুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button